পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ (General Category) নাগরিকদের জন্য EWS সার্টিফিকেট এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি নথি। সরকারিভাবে শিক্ষা, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা এবং বিভিন্ন সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ১০% সংরক্ষণের সুবিধা পেতে হলে এই সার্টিফিকেট থাকা বাধ্যতামূলক। আগে এই নথি তৈরিতে সময়, ঝামেলা এবং লম্বা লাইনে দাঁড়ানোর প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এখন পশ্চিমবঙ্গ সরকার সম্পূর্ণ অনলাইনে EWS সার্টিফিকেটের আবেদন প্রক্রিয়া শুরু করায় পুরো ব্যবস্থাই হয়ে উঠেছে সহজ, দ্রুত এবং স্বচ্ছ।

নতুন এই ডিজিটাল প্রক্রিয়ার ফলে নাগরিকরা বাড়িতে বসেই খুব সহজে আবেদন করতে পারছেন, জমা দিতে পারছেন প্রয়োজনীয় নথি এবং ট্র্যাক করতে পারছেন নিজের আবেদনপত্রের স্ট্যাটাস। চলুন দেখে নেওয়া যাক — যোগ্যতার নিয়ম, প্রয়োজনীয় নথি, আবেদন পদ্ধতি এবং সার্টিফিকেট পাওয়ার সম্পূর্ণ ধাপসমূহ।

EWS সার্টিফিকেট কী এবং কেন এটি প্রয়োজন?

EWS বা Economically Weaker Section— সাধারণ কথায় অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল সাধারণ শ্রেণীর মানুষের জন্য নির্ধারিত একটি সংরক্ষণ ব্যবস্থা। ভারত সরকার ২০১৯ সালে EWS কোটার মাধ্যমে ১০% সংরক্ষণ চালু করে। এর মাধ্যমে সাধারণ শ্রেণীর সেই সকল পরিবার যাদের আর্থিক সামর্থ্য কম, তারা শিক্ষা বা চাকরির ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পান।

পশ্চিমবঙ্গে এখন এই সার্টিফিকেটের আবেদন অনলাইনে করা যায়। ফলে সময় এবং পরিশ্রম দুটোই অনেক কমে গেছে।

EWS সার্টিফিকেট পাওয়ার যোগ্যতা — কারা আবেদন করতে পারবেন?

EWS সার্টিফিকেট পেতে হলে কিছু নির্দিষ্ট যোগ্যতা থাকতে হয়। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বর্তমান নীতি অনুযায়ী নিয়মগুলো হল—

১. আবেদনকারী অবশ্যই সাধারণ (General Category) হতে হবে

EWS সুবিধা শুধুমাত্র General Category-এর নাগরিকদের জন্য। SC/ST/OBC শ্রেণীর কোনও ব্যক্তি এটির জন্য যোগ্য নন।

২. পরিবারের বার্ষিক আয় ৮ লক্ষ টাকার কম হতে হবে

পরিবার বলতে বোঝানো হচ্ছে —

  • আবেদনকারী
  • মা–বাবা/অভিভাবক
  • স্বামী/স্ত্রী
  • ১৮ বছরের নিচের সন্তান

যদি পুরো পরিবারের বার্ষিক আয় ৮ লক্ষ টাকার বেশি হয়, তাহলে EWS সার্টিফিকেট পাওয়া যাবে না।

৩. কৃষি জমির পরিমাণ নিয়ন্ত্রিত হতে হবে

  • পরিবারের মালিকানাধীন জমি ৫ একরের বেশি হলে আবেদন করা যাবে না।

৪. পৌর ও গ্রামীণ এলাকায় জমির সীমাবদ্ধতা

এলাকা জমির পরিমাণ যোগ্যতা
পৌরসভা ১০০ বর্গগজের বেশি প্লট থাকলে EWS পাওয়া যাবে না
পৌরসভার বাইরে ২০০ বর্গগজের বেশি প্লট থাকলে অযোগ্য
ফ্ল্যাট/বাড়ি ১০০০ বর্গফুটের বেশি হলে অযোগ্য

যদি উল্লিখিত সীমার বেশি সম্পত্তি থাকে, তাহলে আবেদন বাতিল হতে পারে।

অনলাইনে EWS সার্টিফিকেট আবেদন— ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ নির্দেশিকা

২০২৩ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার EWS সার্টিফিকেটের জন্য অনলাইন প্রক্রিয়া চালু করেছে। এতে আবেদনকারীরা নিজেদের মোবাইল বা কম্পিউটার দিয়ে সহজেই আবেদন করতে পারছেন।

অনলাইনে আবেদন করার ধাপগুলো নিম্নরূপ—

ধাপ ১: অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন

প্রথমে ভিজিট করুন
castcertificatewb.gov.in
এটি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অফিসিয়াল কাস্ট সার্টিফিকেট পোর্টাল।

ধাপ ২: “Apply for EWS” অপশনে ক্লিক করুন

হোমপেজে “Apply for EWS” অপশন দেখতে পাবেন। সেখান থেকে আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হবে।

ধাপ ৩: স্টেট বা সেন্ট্রাল ফরম্যাট নির্বাচন করুন

দুটি ধরণের EWS সার্টিফিকেট থাকে—

  • State EWS Certificate
  • Central EWS Certificate

আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী যেটি দরকার, সেটি সিলেক্ট করুন।

ধাপ ৪: জেলা, মহকুমা, ব্লক বা পৌরসভা নির্বাচন করুন

আপনি কোন এলাকার বাসিন্দা, তার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় অপশন সিলেক্ট করতে হবে।

ধাপ ৫: ব্যক্তিগত তথ্য পূরণ করুন

এখানে দিতে হবে—

  • আবেদনকারীর নাম
  • বাবার নাম
  • মোবাইল নম্বর
  • ইমেল আইডি
  • আধার নম্বর
  • ভোটার আইডি
  • জন্মতারিখ
  • লিঙ্গ
  • ধর্ম
  • জাতি (General)

সব তথ্য অবশ্যই সঠিকভাবে দিতে হবে।

ধাপ ৬: ঠিকানার তথ্য আপলোড করুন

বর্তমান ঠিকানা এবং স্থায়ী ঠিকানা সঠিকভাবে লিখে দিন। প্রয়োজনে ঠিকানার প্রমাণপত্র আপলোড করতে হবে।

ধাপ ৭: দুইজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির তথ্য দিন

আপনার এলাকার দুইজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির নাম, ঠিকানা এবং যোগাযোগ নম্বর দিতে হবে।
তারা আবেদনকারীর ঠিকানা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

ধাপ ৮: পাসপোর্ট সাইজ ছবি আপলোড করুন

সাম্প্রতিক তোলা রঙিন পাসপোর্ট সাইজ ফটো আপলোড করতে হবে।

ধাপ ৯: পরিবারের আয় সংক্রান্ত তথ্য দিন

  • আপনার নিজের
  • বাবা-মা
  • স্বামী/স্ত্রী

যদি একাধিক উৎস থেকে আয় থাকে, সবকিছু উল্লেখ করতে হবে।

ধাপ ১০: সম্পত্তির বিবরণ দিন

যদি পরিবারের নামে জমি বা ফ্ল্যাট থাকে, তার বিবরণ দিতে হবে।
(আয়তন বেশি হলে আবেদন বাতিল হতে পারে।)

ধাপ ১১: প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট আপলোড করুন

স্ক্যান করে PDF বা JPG ফরম্যাটে আপলোড করতে হবে।

ধাপ ১২: আবেদন জমা দিন

সব তথ্য সঠিকভাবে পূরণ করার পর Submit বাটনে ক্লিক করলে আপনার আবেদন সম্পন্ন হবে।
সাথে সাথে ডাউনলোড হবে—

  • Application Form
  • Acknowledgement Slip

এগুলো প্রিন্ট করে জমা রাখতে হবে।

ধাপ ১৩: ব্লক/মহকুমা অফিসে নথি জমা দিন

অনলাইনে আবেদন করার পরও
ব্লক অফিস বা মহকুমা শাসকের দপ্তরে কাগজপত্রের জেরক্স কপি জমা দিতে হবে।
তারা যাচাই করে সার্টিফিকেট ইস্যু করেন।

EWS সার্টিফিকেটের জন্য প্রয়োজনীয় নথির তালিকা

মসৃণ ভাবে আবেদন সম্পন্ন করতে নিম্নলিখিত ডকুমেন্টগুলির প্রয়োজন হবে—

নথি বিস্তারিত
আধার কার্ড / রেশন কার্ড পরিচয়পত্র
বাবা-মায়ের ভোটার আইডি পরিবার যাচাই
প্যান কার্ড আয় যাচাই
জন্ম সনদ / মাধ্যমিক অ্যাডমিট বয়সের প্রমাণ
ইনকাম সার্টিফিকেট BDO/SDO কর্তৃক প্রদত্ত
কাস্ট সার্টিফিকেটের প্রমাণ পঞ্চায়েত/চেয়ারম্যান
জমির দলিল/পর্চা সম্পত্তির প্রমাণ
সেলফ ডিক্লারেশন নিজ দায়িত্বে ঘোষণাপত্র

EWS সার্টিফিকেট কখন পাওয়া যায়?

সাধারণত
✔ সবকিছু সঠিক থাকলে
✔ কাগজপত্র জমা দেওয়া হলে
✔ BDO বা SDO যাচাই সম্পন্ন হলে

প্রায় ১৫–৩০ দিনের মধ্যে সার্টিফিকেট পাওয়া যায়।
অনেক ক্ষেত্রে সময় কমও লাগতে পারে।

EWS সার্টিফিকেটের গুরুত্ব — কেন আজই আবেদন করবেন?

  • সরকারি চাকরিতে ১০% সংরক্ষণ
  • কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা সুবিধা
  • UPSC–WBCS–SSC–Railway সহ সকল পরীক্ষায় বিশেষ সুযোগ
  • স্কলারশিপ বা বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে সুবিধা

যাদের আর্থিক সামর্থ্য কম, তাদের জন্য এই সার্টিফিকেট বিশেষ উপকারী।

পশ্চিমবঙ্গে এখন EWS সার্টিফিকেট পাওয়া সত্যিই খুব সহজ হয়ে গিয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াটি অনলাইনে চলে আসায় এখন আর দালাল বা অতিরিক্ত খরচের সমস্যা নেই। সাধারণ পরিবারের আর্থিক দুর্বলতার কারণে যারা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা বা উচ্চশিক্ষায় পিছিয়ে পড়তেন, তাদের জন্য এটি বড় সুবিধা।

যদি আপনি যোগ্য হন এবং প্রয়োজনীয় নথিগুলি হাতে থাকে, তাহলে আজই আবেদন করে নিতে পারেন আপনার EWS Certificate। সরকার যেমন ডিজিটাল পরিষেবা বাড়াচ্ছে, তেমনি সাধারণ মানুষের জন্য এটি হয়ে উঠেছে দ্রুত, সহজ এবং স্বচ্ছ একটি সেবা।