ভারতের সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে বড় বিতর্ক শুরু হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বি.আর. গাভাই (Chief Justice BR Gavai) তফশিলি জাতির জন্য সংরক্ষণ নীতিতে ‘ক্রিমি লেয়ার’ চালুর পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। এর ফলে দেখা যাবে তপশিলি জাতিরা আর সংরক্ষণের সুবিধা পাবেন না। ইতিমধ্যেই জানানো হয়েছে প্রচুর তপশিলি জাতি সংরক্ষণের সুবিধা নিচ্ছেন যদিও এটি বাতিল করা দরকার বলে মন্তব্য করেছেন বিচারপতি।এই বক্তব্য ভারতের সংরক্ষণ নীতি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে নতুন মাত্রা তৈরি করেছে।

SC Reservation Policy Debate
SC Reservation Policy Debate

অন্ধ্রপ্রদেশের অমরাবতীতে অনুষ্ঠিত “India and the Living Indian Constitution @ 75 Years” শীর্ষক অনুষ্ঠানে তিনি বিপুল দর্শকের সামনে নিজের মতামত প্রকাশ করেন। এবং এখানেই তিনি এই বক্তব্য রেখেছেন এবং বলেছেন তপশিলি জাতি অর্থাৎ বিশেষ করে যারা SC ক্যাটাগরির তাদের সংরক্ষণ নীতি বাতিলের কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী—

“যারা আর্থিকভাবে উন্নত ও সামাজিকভাবে এগিয়ে— তাদের তফশিলি জাতির সংরক্ষণের আওতায় রাখা উচিত নয়।”

এই মন্তব্যের পর থেকেই রাজনৈতিক মহল থেকে নীতিনির্ধারক, গবেষক, আইন বিশেষজ্ঞ— সবাই নতুন করে সংরক্ষণ নীতি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন। বিশেষ করে যারা তপশিলি জাতি এবং সংরক্ষণের আওতায় আসে তারা এই নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন।

কেন এই মন্তব্য গুরুত্বপূর্ণ?

  • ভারতীয় সংবিধানে সংরক্ষণ একটি মৌলিক সামাজিক নীতি
  • তফশিলি জাতি ও তফশিলি উপজাতি ঐতিহাসিকভাবে বৈষম্যের শিকার
  • সংরক্ষণ সুবিধা দিয়ে তাদের সামাজিক–শিক্ষাগত–অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা হয়
  • তবে, সমাজের একাংশ মনে করে যে, কয়েক দশকের উন্নতির ফলে SC শ্রেণির মধ্যেও এখন দুটি স্তর তৈরি হয়েছে
    • একদল আর্থিকভাবে উন্নত (Creamy Layer)
    • একদল এখনও অত্যন্ত পিছিয়ে

প্রধান বিচারপতির বক্তব্য এই বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসে। তবে পশ্চিমবঙ্গে তথা সমগ্র ভারতবর্ষে এখনো জাতিগতভাবে অনেক বৈষম্য দেখা যায় আর সেই জন্যই সংবিধান এই সমস্ত জাতিদের সংরক্ষণের নীতি দিয়েছেন। তবে এই নিয়ে এই সংরক্ষণ বিরোধিতা করলে যারা সংরক্ষণের আওতায় আসেন তারা অবশ্যই সমালোচনা করবেন।

প্রধান বিচারপতির বক্তব্য: মূল পয়েন্টগুলো

নীচের টেবিলে বিচারপতির বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলি তুলে ধরা হলো:

বিষয় প্রধান বিচারপতির মন্তব্য
সংরক্ষণের উদ্দেশ্য প্রকৃতভাবে পিছিয়ে পড়া নাগরিকদের উন্নয়ন
‘ক্রিমি লেয়ার’ ধারণা এটি OBC-র মতো SC-দের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা উচিত
উদাহরণ একজন আইএএসের সন্তান বনাম দরিদ্র কৃষকের সন্তান— দুইজনকে একই জায়গায় রাখা যায় না
সংবিধানের স্তম্ভ ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা, সমতা, ভ্রাতৃত্ব— এগুলো রক্ষা জরুরি
নারীর অধিকার দেশে নারীর অগ্রগতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে
নিজের অবসর “আমার অবসর আর এক সপ্তাহ বাকি— তাই কিছু কথা বলে ফেললাম।”

 সংরক্ষণ কেন প্রয়োজন?

সংরক্ষণ ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ছিল—

  • ঐতিহাসিকভাবে বঞ্চিতদের uplift করা এবং তারা যাতে সমাজের মূলধারায় ফিরে আসতে পারে সেদিকে নজর দেওয়া।
  • শিক্ষায় প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো এবং সংরক্ষণের জন্য শিক্ষা ক্ষেত্রে আসন সংরক্ষণ করা যার দরুন সকলেই শিক্ষায় সমান অধিকার পায়।
  • কর্মসংস্থানে সুযোগ বাড়ানো এবং সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে সংরক্ষণের সুযোগ দেওয়া।
  • সামাজিক বৈষম্য কমানো
  • রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায়ন এবং রাজনৈতিক বিভিন্ন পদে এদের সুযোগ দেওয়া।

দীর্ঘ দিনের জাতিভিত্তিক বৈষম্য, আপমান ও শোষণের বিরুদ্ধে সংবিধান সংরক্ষণকে একটি নিরাপত্তা বলয় হিসেবে নির্ধারণ করেছে। তাই এই সংবিধানের বিপক্ষে তথা এই কাস্ট সিস্টেম তুলে দেওয়া হলে বা তপশিলি জাতিদের সংরক্ষণ নীতি তুলে দিলে এই নিয়ে তীব্র সমালোচনা এবং তীব্র বিরোধিতা হবে।

কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সমাজের অবস্থা অনেক বদলেছে।
SC সম্প্রদায়ের অনেকেই এখন—

  • উচ্চশিক্ষিত
  • সমৃদ্ধ
  • সরকারি উচ্চপদস্থ
  • কর্পোরেটক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত

ফলে প্রশ্ন উঠছে—
যারা উন্নত, তাদের কী এখনও সংরক্ষণের দরকার আছে? এটাই হচ্ছে সবথেকে বড় প্রশ্ন? বিশেষভাবে সংবিধানের সংরক্ষণ দেওয়া হয়েছিল যারা আর্থিকভাবে পিছিয়ে এবং সমাজের মূলধারা থেকে পিছিয়ে তাদের সমাজের মূলধারায় নিয়ে এসে আর্থিক দিক দিয়ে সচ্ছল করার।

 ‘ক্রিমি লেয়ার’: কী এবং কেন?

OBC শ্রেণির মধ্যে ‘ক্রিমি লেয়ার’ ব্যবস্থা চালু হয় ইন্দ্রা সাহনি বনাম ভারত সরকার (1992) মামলার রায় অনুযায়ী। এখানে যারা অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে রয়েছে তাদের ক্রিমিলিয়ার দেওয়া হয় এর ফলে এরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের সংরক্ষণ নীতির অনেক কম সুযোগ সুবিধা পায়।

এই ব্যবস্থার লক্ষ্য:

  • যাদের আয়, সামাজিক মর্যাদা বা পেশাগত স্থিতি উচ্চ— তারা সংরক্ষণ সুবিধা পাবেন না
  • এর ফলে প্রকৃতভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের উন্নয়ন নিশ্চিত হয়

প্রধান বিচারপতির মন্তব্য—
এই একই নীতি SC শ্রেণিতেও প্রয়োগ করা উচিত।

 SC শ্রেণিতে ক্রিমি লেয়ার প্রয়োগ না হওয়ার কারণ

অনেক সমাজবিজ্ঞানী এবং আইন বিশেষজ্ঞ মনে করেন—

  • জাতিভিত্তিক ‘untouchability’-র অভিজ্ঞতা এখনও প্রজন্ম ধরে চলে
  • আর্থিক উন্নতি হলেও সামাজিক বৈষম্য অনেকক্ষেত্রে কমেনি
  • তাই SC-দের ক্ষেত্রে OBC-এর মতো ‘ক্রিমি লেয়ার’ প্রয়োগ করা কঠিন

এছাড়াও—

  • সংবিধানে SC-দের সংরক্ষণের উদ্দেশ্য কেবল আর্থিক নয়
  • সামাজিক ন্যায় নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ

ফলে এই ব্যাপারে বহু মতবিরোধ রয়েছে।

 তাহলে কেন প্রধান বিচারপতি নতুন বিতর্ক তুললেন?

বর্তমানে অনেক সরকারি চাকরিতে দেখা যাচ্ছে—

  • SC শ্রেণির মধ্যেও শুধুমাত্র কিছু পরিবার বারবার সংরক্ষণের সুবিধা পাচ্ছে
  • সুবিধাবঞ্চিতরা পিছিয়েই রয়ে যাচ্ছে
  • আর্থিকভাবে উন্নত SC পরিবার সংরক্ষণের সুযোগ পেলে প্রকৃতভাবে অসহায়রা পিছিয়ে পড়ে

ফলে এই ব্যবস্থাকে “ইন্টারনাল অসমতা” বা অভ্যন্তরীণ বৈষম্য বলা হচ্ছে। এর ফলেই তিনি এই মন্তব্য করেছেন।

প্রধান বিচারপতির মতে—

“সংরক্ষণের সুবিধা যেন সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র, পিছিয়ে পড়া অংশের কাছে পৌঁছায়।”

 সংরক্ষণ নীতিতে সম্ভব ভবিষ্যৎ পরিবর্তন?

যদিও এখনই কোনও সরকারি সিদ্ধান্ত নেই, তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন—

ভবিষ্যতে SC সংরক্ষণে এই পরিবর্তন আসতে পারে:

  • আয় নির্ধারণ করে ‘ক্রিমি লেয়ার’ প্রয়োগ
  • সামাজিক–শিক্ষাগত মান বিবেচনায় আলাদা মানদণ্ড তৈরি
  • উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারী পরিবারের সন্তানদের সংরক্ষণ থেকে বাদ
  • তফশিলি জাতির মধ্যে অভ্যন্তরীণ সমতা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ

এখনো এটি কেবল আলোচনা স্তরে।
কিন্তু প্রধান বিচারপতির বক্তব্য সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে পারে।

 নারীর অধিকার প্রসঙ্গে ইতিবাচক বার্তা

বক্তৃতায় বিচারপতি বলেন—

  • দেশে মেয়েদের শিক্ষার হার বেড়েছে
  • কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে
  • আদালত ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে নারীর সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক বেশি
  • বৈষম্যের পুরনো নিয়ম ভাঙছে

তিনি বলেন—

“দেশে নারীর ক্ষমতায়ন এক নতুন অধ্যায় শুরু করেছে।”

সংক্ষেপে বিতর্কের সারমর্ম

বিষয় বর্তমান ব্যবস্থা বিচারপতির প্রস্তাব
সংরক্ষণ সুবিধা আর্থ–সামাজিক বিচার ছাড়াই SC শ্রেণির সবাই পান আর্থিকভাবে উন্নত SC-দের বাদ দিতে হবে
লক্ষ্য ঐতিহাসিক বৈষম্য দূর করা প্রকৃতভাবে বঞ্চিতদের জন্য নীতি কেন্দ্রীভূত করা
উদাহরণ সকলকে সমান সুবিধা IAS অফিসারের সন্তান ≠ কৃষকের সন্তান
বিতর্ক সামাজিক অসমতা আছে অভ্যন্তরীণ অসমতাও দূর করা উচিত

 

প্রধান বিচারপতি বি.আর. গাভাইয়ের এই মন্তব্য ভারতীয় সমাজে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সংরক্ষণ নীতির ভবিষ্যত কোন পথে যাবে— তা এখনই বলা কঠিন, তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়—

এই বক্তব্য দেশের সামাজিক নীতিতে বড় প্রভাব ফেলবে।

সংরক্ষণ কি শুধুই সামাজিক ন্যায় নিশ্চিত করবে, নাকি আয়ের ভিত্তিতে নতুন করে শ্রেণিবিভাগ হবে— আগামী দিনে তা আরও স্পষ্ট হবে।