ডিজিটাল যুগে মানুষের জীবন আরও দ্রুত, সহজ এবং ঝামেলাহীন করার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার আবারও এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আপনি এবার ঘরে বসেই পেয়ে যাবেন পঞ্চায়েতের সমস্ত সার্টিফিকেট এমনকি ইনকাম সার্টিফিকেটও। আপনার হাতে যদি মোবাইল থেকে থাকে তাহলে আপনিও এটি পেতে পারেন। বিশেষ করে গ্রামের সাধারণ মানুষের জন্য সরকারি অফিসে লম্বা লাইনে দাঁড়ানো, বারবার দপ্তরে যাওয়া, কাগজপত্রের ঝামেলা—এই সমস্ত সমস্যাকে কমিয়ে দিতে রাজ্য সরকার পুরো প্রক্রিয়াটিকে ডিজিটাল করেছে। এবার থেকে নাগরিকরা নিজের বাড়িতে বসেই স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ ব্যবহার করে অনলাইনেই ইনকাম সার্টিফিকেট এবং রেসিডেন্সিয়াল সার্টিফিকেট তৈরি করে নিতে পারবেন। বর্তমান দিনের পর দিন সমস্ত কিছুর ডিজিটাল হচ্ছে তাই সমস্ত কিছু ঘরে বসেই করা সম্ভব। গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার বাসিন্দাদের জন্য এই পরিষেবা চালু হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

গ্রামাঞ্চলের মানুষের জন্য বড় স্বস্তি – সরকারি অফিসের লাইনের ঝামেলা আর নেই

আগে আয় সনদ বা বাসিন্দা সনদ পাওয়ার জন্য পঞ্চায়েত অফিসে গিয়ে আবেদন করতে হতো। এজন্য অনেকের একটি পুরো দিন নষ্ট করে এই কাগজের জন্য পঞ্চায়েতে পঞ্চায়েতে দৌড়াতে হতো। অনেক সময় একাধিকবার যেতে হতো, কখনও কাগজপত্র অসম্পূর্ণ, কখনও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অনুপস্থিতি—ফলে সাধারণ মানুষ বিশেষ করে কৃষক, দিনমজুর, গৃহবধূ বা বয়স্কদের অত্যন্ত অসুবিধার মধ্যে পড়তে হতো। এবার সেই সমস্যার অবসান। আর আপনাকে কোথাও দৌড়াতে হবে না।

ডিজিটাল পরিষেবার মাধ্যমে নাগরিকরা চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই বাড়িতে বসে সার্টিফিকেট পেয়ে যেতে পারবেন। সরকারের এই সিদ্ধান্ত গ্রামাঞ্চলের ডিজিটাল ক্ষমতায়নের পথে বড় মাইলফলক হয়ে উঠেছে।

ডিজিটাল সার্টিফিকেট কী? কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

ইনকাম সার্টিফিকেট (Income Certificate) প্রধানত ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে ছাড়, কিস্তিমুক্ত ঋণ বা সরকারি চাকরির আবেদন—এই সব ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে, রেসিডেন্সিয়াল সার্টিফিকেট (Residential Certificate) যে কোনো সরকারি নথি, ঠিকানার প্রমাণ, ভর্তির কাজ বা কাস্ট সার্টিফিকেট পেতে অত্যন্ত জরুরি।

ডিজিটাল সিস্টেম চালু হওয়ায়—

  • নথির সত্যতা যাচাই সহজ হবে
  • কাগজপত্র হারানোর ঝুঁকি কমবে
  • দুর্নীতি বা দালালচক্রের সুযোগ কমবে
  • আবেদনকারীর সময় ও যাতায়াত খরচ বাঁচবে

সরকারের লক্ষ্য—গ্রামে-গ্রামে ডিজিটাল পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া এবং প্রশাসনকে আরও স্বচ্ছ ও দ্রুতগামী করা।

WBPMS পোর্টাল – এক প্ল্যাটফর্মে সব পরিষেবা

এই পরিষেবা দেওয়া হচ্ছে রাজ্য সরকারের ডিজিটাল পোর্টাল WBPMS (West Bengal Public Management System)-এর মাধ্যমে। এই ওয়েবসাইট থেকেই আপনি যাবতীয় কাজকর্ম করতে পারবেন। এই প্ল্যাটফর্মে গিয়ে নাগরিকরা নিজেদের স্মার্টফোন থেকেই আবেদন করতে পারবেন।

এখানে আবেদন করার সুবিধাগুলো হলো—

  • মোবাইল OTP দিয়ে সহজ লগইন
  • নিজস্ব জেলা–ব্লক–গ্রাম নির্বাচন
  • কাগজপত্র স্ক্যান করে সরাসরি আপলোড
  • ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সার্টিফিকেট ইস্যু
  • ডাউনলোডযোগ্য রঙিন ডিজিটাল কপি
  • যেকোনো সময় অ্যাপ্লিকেশন স্ট্যাটাস চেক

সারা প্রক্রিয়াটি সহজবোধ্য, তাই একজন সাধারণ নাগরিকও সহজেই আবেদন করতে পারবেন। সব থেকে বড় কথা হল আপনার মোবাইলের সঙ্গে লিংক করে আপনি যে কোন কাগজ এখান থেকে বের করতে পারবেন এবং ওটিপির মাধ্যমে আপনার সমস্ত কিছু সুরক্ষিত থাকবে।

আবেদনের জন্য কোন কোন নথি লাগবে?

ডিজিটাল সার্টিফিকেট পেতে আবেদনকারীকে কয়েকটি প্রয়োজনীয় নথি আপলোড করতে হবে। সকল নথি পরিষ্কার ছবি বা স্ক্যান করা কপি হিসেবে রাখতে হবে।

নথিগুলি হল—

  • রঙিন পাসপোর্ট সাইজ ছবি
  • ভোটার কার্ড (EPIC)
  • আধার কার্ড
  • পঞ্চায়েত সদস্যের রেকমেন্ডেশন ফরম্যাট

এই চারটি নথি থাকলেই আবেদন সম্পূর্ণ করা যায়। তবে ফাইলের সাইজ নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখতে হবে যাতে সহজে আপলোড হয়।

ডিজিটাল সিস্টেমের বড় সুবিধা – মাত্র ২৪ ঘণ্টায় সার্টিফিকেট!

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল—এই পরিষেবায় মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সার্টিফিকেট ইস্যু হয়ে যায়।

আগে যেখানে—

  • পঞ্চায়েতে অফিস যাওয়া
  • লাইন দাঁড়ানো
  • নথি যাচাই
  • ফলোআপ
    সব মিলিয়ে ৫–৭ দিন লেগে যেত, এখন সেই পুরো প্রক্রিয়া মাত্র একদিনেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।

এটি পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে ডিজিটাল প্রশাসনের উন্নতির বড় উদাহরণ।

ধাপে ধাপে আবেদন করার পদ্ধতি – সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা

অনেক নাগরিকের মনে আবেদন নিয়ে ভয় থাকে। তাই নীচে পুরো প্রক্রিয়াটি সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হলো যাতে যে কেউ সহজেই ফলো করতে পারেন।

১) WBPMS পোর্টালে প্রবেশ করুন

যে কোনো ব্রাউজার বা স্মার্টফোন থেকে WBPMS পোর্টালে যান।

২) ‘Citizen Corner’ সিলেক্ট করুন

এখান থেকেই সাধারণ নাগরিকরা সব পরিষেবা পাবেন।

৩) মোবাইল নম্বর দিয়ে OTP ভেরিফিকেশন করুন

OTP ভেরিফাই হলেই অ্যাকাউন্ট তৈরি হয়ে যাবে।

৪) নিজের জেলা → ব্লক → গ্রাম পঞ্চায়েত নির্বাচন করুন

এতে আবেদন সঠিক পঞ্চায়েতে পৌঁছাবে।

৫) আবেদনকারী ও অভিভাবকের নাম লিখুন

ঠিকানা, সংসদ নম্বর, ফোন নম্বরও উল্লেখ করতে হবে।

৬) কোন সার্টিফিকেট চাইছেন তা নির্বাচন করুন

  • ইনকাম সার্টিফিকেট
  • রেসিডেন্সিয়াল সার্টিফিকেট

৭) নথিপত্র আপলোড করুন

প্রতিটি স্ক্যানড ডকুমেন্ট সঠিক স্লটে আপলোড করতে হবে।

৮) সাবমিট করুন

ফর্ম সাবমিট হলেই আবেদন গ্রহণ করা হবে।

৯) ২৪ ঘন্টা পরে ‘Application Status’ দেখুন

পঞ্চায়েত প্রধান বা সংশ্লিষ্ট আধিকারিক আবেদন অনুমোদন করলে স্ট্যাটাস দেখাবে—
“Ready to Download”

১০) রঙিন ডিজিটাল সার্টিফিকেট ডাউনলোড করুন

একটি ডিজিটাল সই করা নথি পিডিএফ আকারে পাওয়া যাবে।

ডিজিটাল সিস্টেম গ্রামাঞ্চলের মানুষকে কীভাবে বদলে দিচ্ছে?

এই পরিষেবাটি শুধু সার্টিফিকেট দেওয়ার কাজ নয়; এর মাধ্যমে সরকারের লক্ষ্য গ্রামাঞ্চলে ডিজিটাল পরিকাঠামোকে শক্তিশালী করা। গ্রামে স্মার্টফোন ব্যবহার বাড়ছে, ইন্টারনেট অ্যাক্সেস সহজ হচ্ছে, আর ডিজিটাল শিক্ষার প্রসারও ঘটছে।

ডিজিটাল পরিষেবার মাধ্যমে মানুষ—

  • সময় বাঁচাতে পারছে
  • দালালের খপ্পর থেকে মুক্তি পাচ্ছে
  • খরচ কমছে
  • স্বচ্ছতা বাড়ছে
  • প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে

এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে বহু সরকারি পরিষেবা ডিজিটাল করার দিকে বড় ভূমিকা রাখবে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ডিজিটাল উদ্যোগ—দেশে নতুন মডেল তৈরি করছে

গত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গ সরকার বিভিন্ন পরিষেবা অনলাইনে নিয়ে আসছে। যেমন—

  • জন্ম ও মৃত্যু সনদ
  • কৃষি অনুদান
  • কন্যাশ্রী–রূপশ্রী আবেদন
  • স্বাস্থ্যসাথী কার্ড
  • ফসল বীমা
  • ভূমিকর পরিষেবা
    এসবের ধারাবাহিকতায় এখন ইনকাম ও রেসিডেন্সিয়াল সার্টিফিকেটও যুক্ত হলো।

এতে গ্রামের মানুষের প্রশাসনিক কাজে সময়, অর্থ এবং পরিশ্রম সবই কমবে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ডিজিটাল পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের জীবনকে নতুনভাবে সহজ করছে। আগে যেখানে সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে দিনে-প্রতিদিন দপ্তরে যেতেও হতো, এখন কয়েকটি ক্লিকের মাধ্যমেই বাড়িতে বসে সমস্ত পরিষেবা পাওয়া যাচ্ছে। এই উদ্যোগ শুধু প্রযুক্তিকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে না, বরং প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা ও স্বচ্ছতা দুটোই বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ভবিষ্যতে রাজ্য সরকারের আরও অনেক পরিষেবা ডিজিটাল মাধ্যমে যুক্ত হবে বলে আশা করা যায়। ডিজিটাল পশ্চিমবঙ্গ সত্যিই বাস্তবায়নের পথে বড় পদক্ষেপ নিল।