ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা Special Intensive Revision (SIR) চলাকালীন ভুয়ো তথ্য ও জাল নথির মাধ্যমে ভোটার তালিকায় নাম তুলতে চাইলে এবার কড়া আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। তাই আপনার বা আপনার পরিবারের যদি কেউ ভুল করে বা ইচ্ছাকৃতভাবে কোন ভুল তথ্য দিয়ে থাকেন তাহলে জেল পর্যন্ত হতে পারে এমনটাই জানালো ইলেকশন কমিশন। এই সতর্কবার্তায় রাজ্যজুড়ে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ আরও কঠোর ও স্বচ্ছ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই অনেক খবর এসেছে কেউ বাবা না হওয়া সত্বেও অন্য কাউকে বাবা বানিয়ে SIR করেছেন তবে এই সমস্ত তথ্য এবার যাচাই করা হবে।

নির্বাচন কমিশনের কড়া বার্তা: জাল নথি মানেই জেল ও জরিমানা

মঙ্গলবার রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর একটি লিখিত বুলেটিন প্রকাশ করে জানায়—

এসআইআরে কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে জাল নথি জমা দেয়, তবে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS) ৩৩৭ ধারায় মামলা হবে। এর ফলে সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও সঙ্গে আর্থিক জরিমানা হতে পারে।

এতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, সরকার প্রদত্ত কোনও পরিচয়পত্র বা আইনি নথি জাল করলে তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। তাই সতর্কতা অবলম্বন করে চলুন এবং ভুল তথ্য কখনোই দিতে যাবেন না।

কোন কোন নথি জাল করলে জেল হতে পারে?

নীচের টেবিলে দেখে নিন কোন নথিগুলি জাল করলে সরাসরি কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হবে—

জাল নথির ধরন বিস্তারিত
ভোটার কার্ড অন্যের পরিচয়ে বা ভুয়ো নথি দিয়ে তৈরি করা
আধার কার্ড ভুল তথ্য দিয়ে বা জাল কাগজপত্র দিয়ে বানানো
জন্ম সনদ বয়স বা পরিচয় বদলানোর উদ্দেশ্যে জাল করা
বিবাহ সনদ ভুয়ো সম্পর্ক তৈরি করে ভোটার সুবিধা নেওয়া
মৃত্যু সনদ মৃত ব্যক্তির পরিচয় ব্যবহার বা অন্যের তথ্য গোপন
সরকারি অফিসিয়াল নথি যেকোনও সরকারি বিভাগের সার্টিফিকেট
আদালতের নথি আইনি প্রক্রিয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রে জাল কাগজ
পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি অন্যের নামে বেআইনি জমি বা সম্পত্তি ব্যবহারে নথি জাল

তাই এবার থেকে পরিচয়পত্র জাল বা ভুল তথ্য দিলে আর রেহাই নেই—ওইসকল নথি সরাসরি অত্যন্ত গুরুতর অপরাধের মধ্যে পড়বে।

কেন এত কঠোর হল কমিশন?

গত কয়েক মাস ধরে পশ্চিমবঙ্গে SIR নিয়ে বেশ কিছু অভিযোগ উঠেছে, বিশেষত—

  • ভোটার তালিকায় অনুপ্রবেশকারীদের নাম রয়ে যাওয়া
  • ভুয়ো নথি দিয়ে পরিচয়পত্র বানানো
  • অন্য কাউকে বাবা-মা সাজিয়ে ভোটার কার্ড নেওয়া
  • সাধারণ নাগরিকদের নামে জাল নথিতে ভোটার লিস্টে নাম তোলা

এই সমস্যাগুলি ঠেকাতে নির্বাচন কমিশন এবার জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছে।

এবার ভুয়ো ভোটার ধরতে আসছে AI প্রযুক্তি

কমিশন জানিয়েছে, এবার ভুয়ো নথি শনাক্ত করতে ব্যবহার করা হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)
এই প্রযুক্তির সাহায্যে—

✔ প্রতিটি ভোটারের নাম
✔ ছবি
✔ বয়স
✔ ঠিকানা
✔ আগের ভোটার রেকর্ড

সবই মিলিয়ে দ্রুত স্ক্যান করা হবে।

যার তথ্য মিলবে না, তাদের ক্ষেত্রে কমিশন সরাসরি তদন্ত শুরু করবে। AI চেকের ফলে ভুয়ো ভোটার বা অনুপ্রবেশকারী দ্রুত শনাক্ত করা যাবে — এমনটাই দাবি কমিশনের। এর ফলে যারা অবৈধ বা ভোটার তাদের খুব সহজেই বাদ দেওয়া যাবে।

 বিরোধীদের অভিযোগ: অনুপ্রবেশকারীদের নাম এখনও রয়ে যাচ্ছে

রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি অভিযোগ করেছে—

  • বিশেষ সংশোধন চললেও ভুয়ো ভোটার এখনও বাদ পড়ছে না
  • বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীরা ভুয়ো পরিচয়পত্র ব্যবহার করছে
  • প্রশাসন ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের নাম তালিকা থেকে বাদ দিচ্ছে না

এই পরিস্থিতিতে কমিশনের কড়া পদক্ষেপ রাজ্যের ভোটার তালিকা পরিষ্কার করতে বড় ভূমিকা নেবে বলে মনে করা হচ্ছে।

 SIR-এর গুরুত্বপূর্ণ তারিখসমূহ (এক নজরে)

নীচের টেবিলে SIR 2025-এর জরুরি তারিখগুলি দেওয়া হল—

তারিখ কাজ
১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ এনুমারেশন ফর্ম আপলোডের শেষ তারিখ
১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ
১৬ ডিসেম্বর – ১৫ জানুয়ারি দাবি ও আপত্তি জানানোর সময়
১৬ ডিসেম্বর – ৭ ফেব্রুয়ারি ERO-এর শুনানি, নথি যাচাই, অভিযোগ নিষ্পত্তি
ফেব্রুয়ারি ২০২৬ চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ (সম্ভাব্য)

সাধারণ মানুষকে কী সাবধানতা মানতে হবে?

✔ জমা দেওয়ার সময় অবশ্যই আসল নথি দিন

জাল বা সন্দেহজনক নথি দিলে সরাসরি ফৌজদারি মামলা হবে।

✔ অন্যের ঠিকানা/নাম ব্যবহার করবেন না

এতে সহজেই AI-চেক ধরে ফেলবে।

✔ জন্মতারিখ, ঠিকানা বা পরিবারের তথ্য ভুল দিবেন না

ভুল প্রমাণ পাওয়া গেলে ভোটার কার্ড বাতিল হয়ে যাবে।

✔ সন্দেহজনক নথি দেখলে ERO-কে জানান

আপনার এলাকায় ভুয়ো ভোটার কমাতে সাহায্য হবে।

পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করতে নির্বাচন কমিশন এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ভুয়ো নথি জমা দেওয়া আর ছোটখাটো বিষয় হিসেবে ধরা হবে না—এখন থেকে এর শাস্তি সর্বোচ্চ সাত বছর জেল পর্যন্ত হতে পারে। সঙ্গে জরিমানাও দিতে হবে। AI-নির্ভর যাচাই-ব্যবস্থা চালু হওয়ায় এবার ভুয়ো ভোটার, নকল পরিচয়পত্র ও অনুপ্রবেশকারীরা আর সহজে পার পাবে না। এই কঠোরতা রাজ্যের ভোটার তালিকাকে পরিষ্কার, নির্ভুল ও বিশ্বাসযোগ্য করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।