ভারতের নাগরিক জীবনের সঙ্গে আধার কার্ড এখন এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে, এটি ছাড়া প্রায় কোনও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কাজই করা যায় না। সমস্ত কাজেই আধার কার্ডের প্রয়োজন হয় তাই মানুষ মনে করে আধার কার্ড একটি নাগরিক প্রমাণপত্র। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা থেকে শুরু করে মোবাইল সিম কেনা, আয়কর রিটার্ন দাখিল, পেনশন বা সরকারি ভর্তুকি নেওয়া—সব ক্ষেত্রেই আধার কার্ড এখন অপরিহার্য। কিন্তু, অনেকেই এখনও জানেন না — আধার কার্ডের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অর্থাৎ, এমন বেশ কিছু কাজ আছে যেখানে আধার কার্ড ব্যবহার করা যাবে না। সমস্ত ক্ষেত্রে আধার কার্ড ব্যবহার করা যায় না।

এই বিষয়ে সম্প্রতি ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (UIDAI) একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে, যেখানে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে— আধার কার্ড শুধুমাত্র “পরিচয়ের প্রমাণ” হিসেবে ব্যবহারযোগ্য, এটি নাগরিকত্ব, জন্মতারিখ বা বাসস্থান প্রমাণের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। তাই যেখানে নাগরিকের প্রমাণ করতে হবে সে সমস্ত জায়গায় আধার কার্ড গ্রহণযোগ্য হবে না এক্ষেত্রে ভোটার তালিকা নিবিড় সংশোধনের জন্যও আধার কার্ড গ্রহণযোগ্য নয়।

 আধার কার্ডের উদ্দেশ্য কী?

আধার কার্ড হল ১২ অঙ্কের একটি ইউনিক আইডেন্টিটি নম্বর, যা ভারত সরকারের UIDAI কর্তৃপক্ষ ভারতীয় নাগরিকদের প্রদান করে। ভারতের পরিচয় পত্র হিসেবে এবং ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন হিসেবে এটি গ্রহণযোগ্য। এই আধার কার্ডের মধ্যে প্রত্যেকটি ব্যক্তির বায়োমেট্রিক সংরক্ষণ করা থাকে। এছাড়াও এই নম্বরের মাধ্যমে প্রতিটি ব্যক্তির বায়োমেট্রিক এবং ডেমোগ্রাফিক তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেসে সংরক্ষণ করা থাকে।
এর মূল উদ্দেশ্য হল—

  1. নাগরিকের পরিচয় যাচাই করা,
  2. বিভিন্ন সরকারি পরিষেবা বা ভর্তুকি সরাসরি তার কাছে পৌঁছে দেওয়া,
  3. প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
  4. সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেতে প্রয়োজন

তবে UIDAI পরিষ্কার জানিয়েছে, আধার নম্বর কোনও নাগরিকের নাগরিকত্ব বা জন্মের প্রমাণ নয়। এটি কেবলমাত্র পরিচয় যাচাই করার একটি মাধ্যম।

 কোন কোন কাজে ব্যবহার করা যায় না আধার কার্ড

UIDAI ও কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ম অনুযায়ী, নিচের ক্ষেত্রগুলোতে আধার কার্ড ব্যবহারযোগ্য নয় বা গ্রহণযোগ্য নয়

১. নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে

নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য আধার কার্ড কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আধার কার্ড থাকলেই কেউ ভারতীয় নাগরিক—এমনটা নয়। বিদেশি নাগরিক বা দীর্ঘদিন ভারতে বসবাসরত অ-নাগরিকরাও আধার নম্বর পেতে পারেন, যদি তারা সরকারের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করেন।
তাই আধার কার্ড ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হলে জন্ম সনদ, পাসপোর্ট, বা নাগরিকত্ব সার্টিফিকেটের প্রয়োজন হয়।

২. জন্মতারিখ প্রমাণের জন্য

আধারে জন্মতারিখ উল্লেখ থাকলেও UIDAI স্পষ্ট জানিয়েছে যে, এটি আইনগতভাবে জন্ম প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। জন্ম প্রমাণের জন্য অন্যান্য নথি প্রয়োজন যেগুলো রাজ্য সরকার অথবা কেন্দ্র সরকারের তরফ থেকে জারি করা হয়। কোনও সরকারি বা আইনি প্রক্রিয়ায় জন্মতারিখ প্রমাণ করতে হলে জন্ম সনদ, মাধ্যমিক অ্যাডমিট কার্ড বা পাসপোর্ট ব্যবহার করতে হবে।

৩. স্থায়ী বাসস্থান বা রেসিডেন্স প্রমাণের জন্য

অনেকে আধারে লেখা ঠিকানাকে নিজের স্থায়ী ঠিকানা ধরে নেন। কিন্তু UIDAI জানিয়েছে, আধারে উল্লেখিত ঠিকানা কেবলমাত্র যোগাযোগের ঠিকানা (communication address)। কোন কাজে যদি আপনার ঠিকানা দেখানোর প্রয়োজন হয় তাহলে আধার কার্ডের ঠিকানা গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে কারণ আধার কার্ডের ঠিকানা যেকোনো সময় পরিবর্তন করা যায়। এটি কোনওভাবেই স্থায়ী বসবাসের প্রমাণ নয়। স্থায়ী বাসস্থান প্রমাণের জন্য প্রয়োজন ভোটার আইডি, রেশন কার্ড, গ্রাম পঞ্চায়েত বা পৌরসভার সার্টিফিকেট ইত্যাদি।

৪. স্কুল বা কলেজ ভর্তি প্রক্রিয়ায় জন্ম প্রমাণ হিসেবে

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে ভর্তি বা পরীক্ষা নিবন্ধনের সময় অনেকেই আধার ব্যবহার করেন জন্ম প্রমাণ হিসেবে। কিন্তু জন্মের প্রমাণ হিসেবে আধার কার্ড গ্রহণযোগ্য নয় এটা বলা হয়েছে আঁধার দপ্তরের তরফ থেকে। শিক্ষা দপ্তর জানিয়েছে, জন্ম সনদই হবে একমাত্র বৈধ প্রমাণ। আধার কার্ড শুধুমাত্র ছাত্রের পরিচয়ের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।

৫. আদালত বা আইনি প্রমাণ হিসেবে

কোনও বিচারিক প্রক্রিয়ায় আধার কার্ড নাগরিকত্ব বা জন্ম প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। আদালতে আধার কার্ড কেবলমাত্র ব্যক্তির পরিচয় যাচাইয়ের জন্য উপস্থাপন করা যেতে পারে।

 তাহলে কোন কোন ক্ষেত্রে আধার ব্যবহার করা যায়?

UIDAI ও সরকার কিছু ক্ষেত্রকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেছে যেখানে আধার অপরিহার্য —

  • ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা বা KYC সম্পূর্ণ করা
  • আয়কর রিটার্ন দাখিল ও PAN কার্ড লিঙ্ক করা
  • মোবাইল সিম কেনা বা পরিবর্তন করা
  • LPG ভর্তুকি, পেনশন বা সরকারি স্কিমের সুবিধা গ্রহণ
  • মিউচুয়াল ফান্ড, পেনশন স্কিম ও বীমা পরিষেবায় যাচাইকরণ
  • কর্মচারী পেনশন বা সরকারি অনুদান প্রাপ্তি

এই ক্ষেত্রগুলোয় আধার “পরিচয়ের প্রমাণ” হিসেবে ব্যবহৃত হয়, কিন্তু অন্য কোনও আইনি প্রমাণ হিসেবে নয়।

 UIDAI-এর নতুন নির্দেশিকা: কী বলছে সরকার

UIDAI সম্প্রতি সমস্ত সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ দিয়েছে—

  • তারা যেন আধারকে শুধুমাত্র Proof of Identity হিসেবে ব্যবহার করে। এছাড়া নাগরিক অর্থে প্রমান হিসেবে এটি গ্রহণযোগ্য নয়।
  • কোনও অবস্থাতেই আধারকে Proof of Citizenship বা Proof of Date of Birth হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। এ সমস্ত কিছু প্রমাণ করতে হলে অন্য নথি চাইতে হবে।
  • ডাক বিভাগ, ব্যাংক ও অন্যান্য সরকারি অফিসগুলোকে বলা হয়েছে, এই নির্দেশিকা নোটিস বোর্ডে স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করতে

এছাড়া UIDAI সতর্ক করেছে— ভুলভাবে আধার ব্যবহার করলে বা নাগরিকত্ব প্রমাণ হিসেবে জমা দিলে ভবিষ্যতে সমস্যায় পড়তে হতে পারে এমনকি নাগরিকত্ব বাতিল পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে।

 আধার আপডেট সংক্রান্ত নতুন নিয়ম ও ফি পরিবর্তন

UIDAI ১ অক্টোবর ২০২৫ থেকে আধার আপডেট সংক্রান্ত নতুন ফি কাঠামো কার্যকর করেছে।

  • নাম, ঠিকানা বা জন্মতারিখ পরিবর্তনের জন্য এখন ফি ₹৭৫, আগে ছিল ₹৫০। অর্থাৎ এখানে ২৫ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে।
  • বায়োমেট্রিক আপডেটের জন্য ফি ₹১২৫, আগে ছিল ₹১০০। এখানেও ২৫ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে।
  • তবে শিশুদের আধার এনরোলমেন্ট ও আপডেট সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। এখানে কোনরকম টাকা ধার্য করা হয় না এবং শিশুদের আধার কার্ড বানানোর জন্য টাকা চাইলেও দেওয়া যাবে না।

শিশুদের বায়োমেট্রিক আপডেট তিন ধাপে বাধ্যতামূলক:
৫ বছর, ৭ বছর ও ১৫–১৭ বছর বয়সে একবার করে বায়োমেট্রিক আপডেট করতে হবে। কারন শিশুদের বায়োমেট্রিক সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন হয় একটি ছোট্ট শিশু পরবর্তীকালে বড় হয়ে তার বায়োমেট্রিক পরিবর্তন হয়।

আধার কার্ড ভারতের ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থার একটি বিপ্লব। এটি নাগরিকদের জন্য জীবনকে সহজ করেছে, সরকারি সুবিধা ও স্বচ্ছতা এনেছে। কিন্তু এর ব্যবহার ক্ষেত্র সীমিত। তবে আধার কার্ড বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজে লাগার ফলে অনেকে মনে করেন আধার কার্ড ভারতের নাগরিকত্বের প্রমাণ, এটি অনেকেরই ভুল ধারণা এবং আধার কার্ড কখনোই ভারতের নাগরিকত্ব প্রমাণ হতে পারে না। আধার দপ্তরের নতুন নিয়ম অনুযায়ী আধার কার্ড শুধুমাত্র একটি পরিচয় পত্র।

তাই এখন থেকেই সচেতন হন। ভুলভাবে আধার জমা দিয়ে ভবিষ্যতের প্রশাসনিক জটিলতায় জড়াবেন না।
আপনার আধার নিরাপদে রাখুন, সঠিক কাজে ব্যবহার করুন, আর আধুনিক ডিজিটাল নাগরিক হিসেবে দায়িত্বশীল হোন।