ভারতের নির্বাচন কমিশন (Election Commission of India) পশ্চিমবঙ্গে শুরু করতে চলেছে SIR – Special Intensive Revision প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে ভোটার তালিকা (Voter List) হালনাগাদ করা হবে। দীর্ঘদিন ধরে এর জল্পনা চলছিল অবশেষে নির্বাচন কমিশন অফিসিয়ালি ভাবে ঘোষণা করে দিল এর দিনক্ষণ। ভোটার তালিকা নিবিড় সংশোধন চলবে এবং এর প্রথম পর্যায়ে সমীক্ষা শেষ হয়ে গিয়েছে। এরপর বাড়ি বাড়ি গিয়ে সমীক্ষা চলবে। কিন্তু এই সমীক্ষায় জানানো হয়েছে আধার কার্ড ভোটার কার্ডের জন্য একমাত্র নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। যাদের ২০০২ এর ভোটার লিস্টের নাম নেই তাদের ক্ষেত্রে আধার কার্ড গ্রহণযোগ্য প্রমাণ হিসেবে ধরা হবে না। তবে এবার কি হবে এবং কাদের নাম বাদ যাবে সে ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে পারবেন এই প্রতিবেদনে। ইতিমধ্যেই ১ নভেম্বর ২০২৫ থেকে এই প্রক্রিয়া শুরু হবে, এবং ধাপে ধাপে বাংলার প্রতিটি জেলায় এটি কার্যকর করা হবে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে নাগরিকদের ভোটাধিকার সঠিকভাবে প্রয়োগ এবং অনুপ্রবেশকারীদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ভারতে প্রকৃত ভোটাররা ভোটরানে অংশগ্রহণ করবেন এবং অবৈধ ভোটারদের ভারত থেকে বিতাড়িত করা হবে।

 SIR কী? কেন এই প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে?

SIR (Special Intensive Revision) হলো একটি বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া, যা নির্বাচন কমিশন পরিচালনা করে নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রস্তুত করতে। নির্বাচন কমিশন কিছু বছর পর পর এই সমীক্ষা করে যাতে অবৈধ কোন ব্যক্তি ভোটার লিস্টে স্থান না পায়। এবারের SIR প্রক্রিয়ায় প্রতিটি বাড়িতে বুথ লেভেল অফিসার (BLO) যাবেন এবং নাগরিকদের হাতে দেবেন একটি ফর্ম — “Enumeration Form”। এই ফর্মে থাকবে সমস্ত তথ্য এবং সেই ফর্মে নাগরিকদের নিজস্ব ও পরিবারের তথ্য পূরণ করে জমা দিতে হবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে। এই ফর্মের ওপর ভিত্তি করেই নাগরিকদের ভোটার তালিকায় নাম থাকা বা না থাকার নির্ভর করবে। তাই ভোটার তালিকা সমীক্ষার সময় যে সমস্ত তথ্য চাইবে সেগুলো আপনাকে সঠিকভাবে দিতে হবে না হলে পরবর্তীকালে সমস্যা হতে পারে।

এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে:

  • মৃত বা অনুপস্থিত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হবে,
  • নতুন ভোটারদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হবে,
  • অনুপ্রবেশকারী বা অবৈধ ভোটারদের চিহ্নিত করা হবে।

 আধার কার্ডের ভূমিকা কী হবে?

অনেকেই মনে করেন, আধার কার্ড থাকলেই ভোটার তালিকায় নাম উঠবে — কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি তেমন নয়। আধার কার্ড নাগরিকত্বের প্রমাণ নয় তবে এটি পরিচয় পত্র হিসেবে ব্যবহার করা যাবে এমনটা বলা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, আধার কার্ড কেবলমাত্র পরিচয়পত্র (Identity Proof) হিসেবে ব্যবহার করা যাবে, নাগরিকত্ব প্রমাণের নথি হিসেবে নয়

অর্থাৎ, আধার দেখিয়ে ভোটার হওয়া যাবে না। যদি কারো নাম ভোটার লিস্টে না থাকে বা নাম বাদ যায় তাহলে সে শুধুমাত্র আধার কার্ড দেখিয়ে ভোটার লিস্টের নাম তুলতে পারবে না। এক্ষেত্রে তাকে বেশ কিছু নথি দেখাতে হবে।তবে নাগরিকত্ব বা পরিচয় প্রমাণের জন্য নিচের ১১টি নির্দিষ্ট নথির মধ্যে যে কোনও একটি দিতে হবে।

 নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত ১১টি নথি:

1. কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকারের চাকরির পরিচয়পত্র অথবা পেনশন প্রমাণপত্র
2. ১ জুলাই ১৯৮৭ সালের আগে ব্যাংক, পোস্ট অফিস বা এলআইসি কর্তৃক ইস্যু করা নথি
3. জন্ম শংসাপত্র (Birth Certificate)
4. পাসপোর্ট
5. মাধ্যমিক বা তার ঊর্ধ্বতন শিক্ষাগত শংসাপত্র
6. রাজ্য সরকারের কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত বাসস্থানের শংসাপত্র
7. ফরেস্ট রাইট সার্টিফিকেট
8. জাতিগত শংসাপত্র (Caste Certificate)
9. ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস (NRC) এর নাম
10. স্থানীয় প্রশাসনের দেওয়া পারিবারিক রেজিস্ট্রার কপি
11. জমি বা বাড়ির দলিল (Land or Property Deed)

এই তালিকার বাইরেও যদি কোনও নথি নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে সক্ষম হয়, তবে নির্বাচন কমিশন সেটিও গ্রহণ করতে পারে। তবে মূলত এই 11 টি নথের মধ্যে যেকোনো একটি নথি যদি আপনার কাছে থেকে থাকে এবং আপনার নাম যদি ভোটার লিস্ট থেকে বাদ চলে যায় তাহলে এই নথি দেখিয়ে আপনি পুনরায় আবার নাম তুলতে পারবেন।

 বাড়ি বাড়ি যাচাই শুরু হবে

SIR প্রক্রিয়ার সময় বুথ লেভেল অফিসাররা (BLOs) প্রতিটি বাড়িতে যাবেন এবং নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহ করবেন। এক্ষেত্রে আপনার কাছে যে সমস্ত তথ্য চাওয়া হবে সেগুলো আপনাকে সঠিকভাবে দিতে হবে। ফর্ম পূরণের সময় নাগরিকদের নিজের আধার কার্ড, ভোটার আইডি এবং নাগরিকত্ব প্রমাণের নথি দেখাতে হবে।
এই তথ্যগুলি যাচাই করে কমিশন ভোটার তালিকা আপডেট করবে।

২০০২ সালের ভোটার তালিকায় যদি আবেদনকারীর বাবা বা মায়ের নাম থাকে, তবে সেই ব্যক্তিরও নাম নতুন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে — এমনটাই কমিশনের নতুন নির্দেশিকায় বলা হয়েছে। এর ফলে যাদের বাবা মায়ের নাম ২০০২ সালের ভোটার লিস্টে রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে কোন সমস্যা হবে না বলে জানা গিয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের অবস্থান

সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছে, “Aadhaar can be used for identification, not as a proof of citizenship.”

অর্থাৎ, আধার কার্ড কোনও ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করতে পারে, কিন্তু নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে এটি এককভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। এই কারণেই নির্বাচন কমিশন ১১টি বিকল্প নথির তালিকা প্রকাশ করেছে।

সর্বদলীয় বৈঠক ও পরবর্তী পদক্ষেপ

ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চ বৈঠকে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন রাজ্য বিশেষ করে বাংলা, অসম, তামিলনাড়ু, কেরল ও পুদুচেরির মতো রাজ্যগুলোতে SIR শুরু হওয়ার আগে রাজ্য ও জেলা স্তরে সর্বদলীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
রাজ্য পর্যায়ে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক এবং জেলা পর্যায়ে জেলা শাসকের নেতৃত্বে এই বৈঠক হবে। তবে নির্বাচন কমিশন সময় ধার্য করে দিয়েছেন যেখানে বলা হয়েছে ১ নভেম্বর থেকে সমগ্র রাজ্যের জেলায় জেলায় শুরু হয়ে যাবে ভোটার তালিকা সমীক্ষা SIR। এরপর সমস্ত রিপোর্ট দিল্লির নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হবে।

কখন শুরু হবে প্রক্রিয়া?

পশ্চিমবঙ্গে ১ নভেম্বর ২০২৫ থেকে SIR প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং তা চলবে পরবর্তী কয়েক মাস ধরে। পশ্চিমবঙ্গে রয়েছে ২০২৬ সালে বিধানসভা নির্বাচনে এবং এই ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে নতুন ও হালনাগাদ ভোটার তালিকা প্রস্তুত হবে।

আধার কার্ড থাকা মানেই ভোটার তালিকায় নাম থাকবে — এই ধারণা ভুল। SIR প্রক্রিয়ায় প্রত্যেক নাগরিককে প্রমাণ দিতে হবে যে তিনি ভারতের নাগরিক এবং স্থায়ীভাবে বাস করছেন। যাদের নাম সঠিকভাবে ভোটার লিস্টে নথিভুক্ত থাকবে তাদের কোন সমস্যা নেই কিন্তু যদি কোন ব্যক্তির নাম ভোটার লিস্ট থেকে বাদ চলে যায় সে ক্ষেত্রে তাকে বেশ কিছু নথি দিয়ে তথ্য প্রমাণ করতে হবে যে সে ভারতীয়। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা অনুযায়ী আধার শুধুমাত্র পরিচয় যাচাইয়ের মাধ্যম, নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। তাই যাদের এখনও প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত নয়, তারা এখনই সেগুলো সংগ্রহ করে রাখুন — কারণ নভেম্বর থেকেই শুরু হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের নতুন ভোটার তালিকা যাচাই অভিযান।