রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। বাড়ি বাড়ি দেওয়া হচ্ছে SIR ফ্রম। এবার প্রতিটি পরিবারের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি — SIR Form (Special Intensive Revision Form)। আপনারা যদি এই ফর্ম বাড়িতে পৌঁছে যায় তাহলে আপনার সতর্ক হওয়া দরকার। অনেকের মনেই এখন প্রশ্ন, এই ফর্মটি কেন দেওয়া হচ্ছে, কিভাবে পূরণ করতে হবে, আর যদি ভুল হয় বা জমা না দেওয়া হয় তাহলে কী হতে পারে? আজকের এই প্রতিবেদনে সেই সব প্রশ্নের সহজ উত্তর দেওয়া হলো।

 SIR ফর্ম আসলে কী?

নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে প্রতি বছর ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার একটি বিশেষ প্রক্রিয়া চালানো হয়। শেষ ২০০২ সালে একবার ভোটার তালিকার সংশোধন করা হয়েছিল আবার পুনরায় ২০২৫ সালের নতুন করে ভোটার তালিকা সংশোধন করা হচ্ছে। এবছর সেই কাজের জন্য বিতরণ করা হচ্ছে SIR ফর্ম। এই ফর্মের মাধ্যমে পরিবারের প্রতিটি ভোটারের তথ্য যাচাই করা হয় — যেমন নাম, বয়স, ঠিকানা, ভোটার নম্বর ইত্যাদি। এর মূল উদ্দেশ্য, ভোটার তালিকাকে সম্পূর্ণ ও সঠিক রাখা। এখানে যদি কারো নতুন করে নাম নথিভুক্ত হয় বা কেউ মারা গিয়ে থাকে তাহলে তার নাম বাদ দেওয়ার জন্যই মূলত এই সার্ভে।

 ফর্ম জমা না দিলে কী সমস্যা হতে পারে?

অনেকেই ভাবেন, “ফর্ম তো পেয়েছি, কিন্তু জমা না দিলেও হয়তো কিছু হবে না।” আপনিও যদি এমনটা ভেবে থাকেন তাহলে এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল! নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, আপনি যদি SIR ফর্ম গ্রহণ করেন, তবে সেটি অবশ্যই জমা দিতে হবে। আপনি যদি জমা না দেন তাহলে আপনাকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে। এর ফলে আপনি বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন। এছাড়াও আপনি যদি ফর্মে বিভিন্ন ধরনের ভুল করে থাকেন তাহলেও এক্ষেত্রে আপনার বিভিন্ন ধরনের সমস্যা হতে পারে।

জমা না দিলে—

  • আপনার নাম খসড়া ভোটার তালিকায় (Draft Roll) থেকে বাদ পড়তে পারে।
  • ভবিষ্যতে ভোটদানের অধিকার সাসপেন্ড হতে পারে। এর ফলে আপনি আর কোনদিন ভোট দিতে পারবেন না।
  • প্রয়োজনে আপনার ঠিকানায় সরকারি নোটিশ পাঠানো হতে পারে। এছাড়াও আপনারা নাগরিকত্ব বাতিল পর্যন্ত হতে পারে।

তাই দেরি না করে ফর্মটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই জমা দিন।

ফর্ম পূরণের সময় যেসব নিয়ম মানতে হবে

ফর্ম পূরণ করা যত সহজ মনে হয়, ততটা নয়। ছোট ভুলও বড় সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই নিচের নিয়মগুলো অবশ্যই মেনে চলুন —

  1. ভাষা: ফর্মটি বাংলায় এসেছে, তাই বাংলায় পূরণ করুন।
  2. ইংরেজি লিখলে: সমস্ত অক্ষর বড় হাতের (CAPITAL LETTERS) হতে হবে। কোন অক্ষর ভুল করে থাকলে সেটি সমস্যা হতে পারে।
  3. কালি: শুধুমাত্র নীল বা কালো বল পয়েন্ট পেন ব্যবহার করুন। অন্য কোন কালার ব্যবহার করলে আপনার ফর্মটা বাতিল হতে পারে।
  4. সংখ্যা: আধার নম্বর বা মোবাইল নম্বর ইংরেজি ডিজিটে (1,2,3) লিখবেন। বাংলা সংখ্যা ব্যবহার করবেন না। বিশেষ করে ইংরেজি 8(আট) ও বাংলা ৪ এর মধ্যে পার্থক্যটা গুলিয়ে ফেলবেন না।
  5. নাম বা কেন্দ্র: নাম, বাবার নাম ও বিধানসভা কেন্দ্র বাংলায় লিখতে পারেন।

জমা দেওয়ার সময়সীমা ও পরামর্শ

সাধারণত হাতে ফর্ম পাওয়ার পর প্রায় এক মাসের মধ্যে জমা দিতে হয়। তাই আপনি ধীরে সুস্থে নির্ভুল ভাবে কোনো রকম ভুল ভ্রান্তি ছাড়াই ফর্মটি ফিলাপ করবেন।তবে শেষ মুহূর্তে রাখবেন না। কারণ BLO (Booth Level Officer) নির্দিষ্ট দিনে ফর্ম সংগ্রহ করতে আসেন।

বিশেষজ্ঞদের কিছু পরামর্শ –

  • ফর্মের আগে একটি ফটোকপি বা জেরক্স করে অনুশীলন করুন। এক্ষেত্রে কোন ভুল হলে সেটি পরবর্তী ক্ষেত্রে সমাধান করতে পারবেন।
  • সব তথ্য যাচাই করে তারপর মূল ফর্ম পূরণ করুন। কোন কিছু না জেনে ফর্মটি ফিলাপ করতে যাবেন না।
  • ভুল হলে কাটাকাটি না করে নতুন ফর্ম নিন
  • ফর্ম জমা দেওয়ার সময় BLO-র সিগনেচার ও সিল নিন

নতুন ভোটার ও মৃত ভোটারের ক্ষেত্রে করণীয়

নতুন ভোটার (১৮ বছর বা তার বেশি বয়স):
যারা সদ্য ১৮ পূর্ণ করেছেন, তাঁদের জন্য আলাদা ফর্ম দেওয়া হবে। সেটি পূরণ করে নাম অন্তর্ভুক্ত করা যাবে।

মৃত ভোটার:
পরিবারে কেউ মারা গেলে চিন্তার কিছু নেই। মৃত ভোটারের জন্য ফর্ম বাড়িতে আসবে না। BLO নিজে সেই তথ্য সংগ্রহ করে রেকর্ডে যুক্ত করবেন।

 যদি পুরনো ভোটার তালিকায় নাম না থাকে?

অনেকের বাড়িতে এখনো ২০০২ সালের পুরনো তালিকা অনুযায়ী ভোটারের তথ্য রয়েছে। যদি তাতে নাম না থাকে, তাহলেও SIR ফর্ম অবশ্যই জমা দিন। এক্ষেত্রে আপনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাপারটি জানান এবং কোন ভুল হলে সেটি অবশ্যই নিজে নিজে সমাধান না করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করুন। ফর্মের নিচের অংশ ফাঁকা রাখুন। পরে নির্বাচন কমিশন খসড়া তালিকায় নাম যুক্ত করবে। এরপর নির্দিষ্ট ১১টি নথির মধ্যে যেকোনো একটি জমা দিলেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।

রাজ্যের প্রতিটি নাগরিকের ভোটাধিকার অক্ষুণ্ণ রাখতে SIR ফর্মের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই প্রক্রিয়াকে অবহেলা না করে সময়মতো জমা দিন। ভোটার তালিকায় নিজের নাম রাখা মানে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নিজের ভূমিকা নিশ্চিত করা।