রাজ্যের হাজার হাজার টেট উত্তীর্ণ চাকরিপ্রার্থীদের জন্য অবশেষে সুখবর আসতে চলেছে। প্রথম পর্যায়ের ইন্টারভিউ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত দ্বিতীয় ধাপের ইন্টারভিউ শুরু হলো না। প্রাইমারি চাকরি প্রার্থীরা এই নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগছেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে চলতি সপ্তাহেই পশ্চিমবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ (WBBPE) নতুন করে প্রাইমারি ইন্টারভিউয়ের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে চলেছে। এবার ইন্টারভিউ প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু বড় বদল আনা হয়েছে। পর্ষদ সূত্রে পাওয়া খবর অনুযায়ী, সমস্ত প্রস্তুতি প্রায় শেষের পথে। এবারের নিয়োগ প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং দ্রুতগতিতে সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। তবে এবারের ইন্টারভিউ প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু কৌশলগত পরিবর্তন এবং ‘ডেমো ক্লাস’-এর ওপর বিশেষ কড়াকড়ি থাকছে বলে জানা যাচ্ছে। এছাড়াও ইন্টারভিউ প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ ভিডিওগ্রাফি করা হবে এবং সমস্ত তথ্য পর্ষদের কাছে থাকবে।

আপনি কি আগামীর শিক্ষক হতে চলেছেন? তাহলে এই প্রতিবেদনটি আপনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্ষদের অন্দরের খবর, ইন্টারভিউয়ের সম্ভাব্য রুটিন, এবং ডেমো ক্লাসের প্রস্তুতি—সবকিছু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো এই প্রতিবেদনে।

চলতি সপ্তাহেই বিজ্ঞপ্তি: পর্ষদের ইঙ্গিত কী?

প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ সূত্রে খবর, খুব দ্রুতই শুরু হবে ইন্টারভিউ প্রক্রিয়া এছাড়াও আইনি জটিলতা কাটিয়ে এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতি সেরে চলতি সপ্তাহের মধ্যেই ইন্টারভিউয়ের অফিশিয়াল নোটিফিকেশন বা বিজ্ঞপ্তি জারি করা হতে পারে। এজন্য অবশ্যই পর্শদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের নজর রাখতে হবে প্রার্থীদের। সামনে সপ্তাহের প্রথম এই ইন্টারভিউ বিজ্ঞপ্তি আসবে। চাকরিপ্রার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে এই মুহূর্তের অপেক্ষায় ছিলেন। পর্ষদ চাইছে, ভোটের আগেই নিয়োগ প্রক্রিয়ার একটি বড় অংশ শুরু করে দিতে। তাই হাতে সময় খুব কম, বিজ্ঞপ্তি বেরোনোর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পোর্টাল ওপেন এবং ইন্টারভিউয়ের তারিখ ঘোষণা করা হবে। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরের সপ্তাহ থেকেই লাগাতার ইন্টারভিউ চলবে তাই আগেভাগে সমস্ত প্রস্তুতি সেরে ফেলছে পর্ষদ।

উত্তরবঙ্গ থেকে শুরু হচ্ছে ইন্টারভিউ প্রক্রিয়া

এবারের ইন্টারভিউ প্রক্রিয়ায় একটি বড় ভৌগোলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সূত্র মারফত জানা গিয়েছে, এবার দক্ষিণবঙ্গের বদলে উত্তরবঙ্গ (North Bengal) থেকে ইন্টারভিউ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। বেঙ্গলি মিডিয়ামের ইন্টারভিউ প্রক্রিয়া খুব সম্ভবত উত্তরবঙ্গের জেলাগুলো থেকেই শুরু হবে।

কেন উত্তরবঙ্গ থেকে শুরু?

প্রশাসনিক কর্তাদের মতে, উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে (যেমন—কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদহ) শূন্যপদ এবং প্রার্থীর অনুপাত বিচার করে এখান থেকেই প্রক্রিয়াটি শুরু করা সুবিধাজনক। দূরের জেলা গুলো আগে ইন্টারভিউ নিয়ে নিলে পরবর্তীকালে কাছের জেলাগুলো দু’একদিন আগে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়ে দিয়েও ইন্টারভিউ নিতে পারবে পর্ষদ। সাধারণত দেখা যায় কলকাতা বা দক্ষিণবঙ্গ থেকে শুরু হলে প্রক্রিয়াটি দীর্ঘায়িত হয়। তাই এবার উল্টো দিক থেকে, অর্থাৎ উত্তর থেকে দক্ষিণে ইন্টারভিউ প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আরো অফিশিয়াল নোটিফিকেশন এলে সঠিক ধারণাটি পাওয়া যাবে।

ভোটের আগেই কি সব জেলায় ইন্টারভিউ হবে?

না, সব জেলায় একসাথে ইন্টারভিউ হবে না। এবছর ইন্টারভিউ এর জন্য প্রচুর ক্যান্ডিডেট আবেদন করেছেন। এর পাশাপাশি সামনেই নির্বাচন, তাই আদর্শ আচরণবিধি বা ‘মডেল কোড অফ কন্ডাক্ট’ চালু হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং এরপর থেকে কোন সরকারি কাজকর্ম করা যায় না সমস্ত কিছু বন্ধ থাকে। পর্ষদ পরিকল্পনা করেছে দুটি ধাপে ইন্টারভিউ নেওয়ার:

১. প্রথম ধাপ (ভোটের আগে): উত্তরবঙ্গের জেলাগুলি এবং জঙ্গলমহল বা কম পরীক্ষার্থী থাকা কিছু জেলার ইন্টারভিউ ভোটের আগেই সেরে ফেলা হবে।

২. দ্বিতীয় ধাপ (ভোটের পরে): দক্ষিণবঙ্গের বড় জেলাগুলি (যেমন—দুই ২৪ পরগনা, মুর্শিদাবাদ, নদিয়া) যেখানে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি, সেগুলির ইন্টারভিউ ভোটের পরে নেওয়া হবে।

তবে লক্ষ্য একটাই—আগস্ট ২০২৬-এর মধ্যে সম্পূর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করা। অর্থাৎ, যারা ইন্টারভিউ দেবেন, তারা যাতে পুজোর আগেই সুখবর পেতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই পর্ষদ এগোচ্ছে। অর্থাৎ এবছরের মধ্যেই এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়ে যাবে।

আগস্টের মধ্যে নিয়োগ সম্পন্ন: পর্ষদের ব্লু-প্রিন্ট

পর্ষদ এবার ‘মিশন মোড’-এ কাজ করছে। বিগত নিয়োগগুলিতে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অনেক সমালোচনা সহ্য করতে হয়েছে। তাই এবার পর্ষদের টার্গেট হলো চলতি বছরের আগস্ট মাসের মধ্যেই প্যানেল প্রকাশ করে নিয়োগপত্র তুলে দেওয়া। এর অর্থ হলো, ইন্টারভিউ প্রক্রিয়াটি হবে অত্যন্ত দ্রুতগতির এবং খুব স্বচ্ছতার সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। প্রতিদিন প্রচুর সংখ্যক প্রার্থীর ইন্টারভিউ নেওয়া হতে পারে। তাই প্রার্থীদের এখন থেকেই মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে।

সতর্ক হোন: ‘ডেমো ক্লাস’ আর মুখস্থ বিদ্যা দিয়ে চলবে না

এবারের প্রাইমারি ইন্টারভিউয়ের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং নির্ণায়ক অংশ হলো ‘অ্যাপটিটিউড টেস্ট’ বা ডেমো ক্লাস (Demo Class)। আগে অনেক প্রার্থী মুখস্থ করা ছকবাঁধা ডেমো দিয়ে পার পেয়ে যেতেন, কিন্তু এবার সেই সুযোগ আর থাকছে না। নিজের দক্ষতা আবার যোগ্যতা যাচাই করতে হবে, ডেমোর ক্ষেত্রে মুখস্ত নির্ভর ডেমো দিলে ইন্টারভিউয়াররা বুঝে যাচ্ছেন তাই নাম্বার কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে। ইউটিউব এর ডেমো সম্বন্ধে ইন্টারভিউয়াররা আগে থেকেই ওয়াকিবহাল। তাই ইউটিউব থেকে ডেমো দিলে তারা ধরে ফেলছেন। এক্ষেত্রে আপনাকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং নিজের দক্ষতা ও যোগ্যতা দেখাতে হবে।

পর্ষদ কী চাইছে?

ইন্টারভিউয়াররা এবার প্রার্থীর ‘স্বতঃস্ফূর্ত শিক্ষণ দক্ষতা’ (Spontaneous Teaching Skill) যাচাই করবেন। আপনি যদি বাড়ি থেকে তোতা পাখির মতো কোনো টপিক মুখস্থ করে যান এবং সেটাই গড়গড় করে বলে দেন, তবে অভিজ্ঞ ইন্টারভিউয়াররা সেটা প্রথম ৩০ সেকেন্ডেই ধরে ফেলবেন। এবং এর ফলে আপনার ইম্প্রেশন খারাপ হতে পারে এবং এক্ষেত্রে আপনাকে মাঝ পথেই থামিয়ে দেবে তারা।

কেন মুখস্থ ডেমো বাতিল হতে পারে?

  • বাস্তববর্জিত: মুখস্থ ডেমোতে অনেক সময় ক্লাসরুমের পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্য থাকে না।

  • কমিউনিকেশনের অভাব: মুখস্থ করলে প্রার্থীর ফোকাস থাকে মনে করার দিকে, ছাত্রছাত্রীদের (ইন্টারভিউয়ারদের) সাথে আই-কন্ট্যাক্ট বা সংযোগ স্থাপনের দিকে নয়।

  • ক্রস কোয়েশ্চেন: আপনি মুখস্থ করে পড়াচ্ছেন, হঠাৎ মাঝখান থেকে ইন্টারভিউয়ার যদি প্রশ্ন করেন, “আচ্ছা, বাচ্চারা যদি এটা না বোঝে তখন আপনি কী করবেন?”—তখনই মুখস্থ বিদ্যায় ছেদ পড়ে এবং প্রার্থী নার্ভাস হয়ে যান।

আপনার প্রস্তুতি কেমন হওয়া উচিত?

পর্ষদ চাইছে এমন শিক্ষক, যার বিষয়বস্তুর ওপর দখল আছে এবং যিনি যেকোনো পরিস্থিতিতে পড়াতে পারেন। তাই প্রস্তুতির সময় নিচের বিষয়গুলোতে জোর দিন:

১. বিষয়ভিত্তিক দখল: ক্লাস ওয়ান থেকে ফাইভ পর্যন্ত বইগুলোর বিষয়বস্তু (সহজ পাঠ, আমার বই, পরিবেশ, গণিত সহ সমস্ত বই) সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখুন। ইন্টারভিউয়াররা যেকোনো বিষয় থেকে পড়াতে বলতে পারেন।

২. হাতে-কলমে শেখানো: চক-ডাস্টার এবং ব্ল্যাকবোর্ড ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ান। বোর্ডে লেখার সময় আপনার হাতের পজিশন, কথা বলার ভঙ্গি—সবই মার্কস বহন করে।

৩. ইন্টারঅ্যাকটিভ মেথড: আপনি যখন ডেমো দেবেন, তখন ইন্টারভিউয়ারদেরই ‘ছাত্র’ মনে করুন। তাদের প্রশ্ন করুন, তাদের উত্তরের প্রশংসা করুন। ক্লাস যেন একঘেয়ে না হয়। স্বতঃস্ফূর্ততা বজায় রাখুন এবং সঠিক উচ্চারণ করুন।

৪. TLM-এর ব্যবহার: এক্ষেত্রে আপনি বাইরে থেকে কোন TLM নিয়ে যেতে পারবেন না শুধুমাত্র হোয়াইট বোর্ড, মার্কার পেন ডাস্টার ব্যবহার করতে পারবেন।

নতুন টেট বিজ্ঞপ্তি: বছরের শেষেই ধামাকা!

যারা আগের টেট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি বা নতুন ডিএলএড পাস করেছেন, তাদের জন্যও সুখবর রয়েছে। চলতি নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরপরই, অর্থাৎ এই বছরের শেষের দিকে (নভেম্বর-ডিসেম্বর নাগাদ) নতুন টেট (Primary TET) পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হতে পারে। ইতিমধ্যেই পর্ষদ সভাপতি গৌতম পাল ঘোষণা করেছিলেন প্রতিবছর টেট পরীক্ষা নেওয়া হবে সেই অনুযায়ী পর্ষদ এখন থেকে প্রতি বছর বা নিয়মিত ব্যবধানে টেট নেওয়ার পরিকল্পনা করছে বলে জানা গেছে। তাই যারা নতুন টেটের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তারা এখন থেকেই পড়াশোনা শুরু করে দিন।

ইন্টারভিউয়ের জন্য ‘চেকলিস্ট’ (Checklist for Success)

নোটিফিকেশন বেরোনোর আগেই নিজেকে গুছিয়ে নিন। শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়ো করবেন না।

  • ডকুমেন্টস: সমস্ত অরিজিনাল মার্কশিট, সার্টিফিকেট, আধার কার্ড, এবং কাস্ট সার্টিফিকেট হাতের কাছে গুছিয়ে রাখুন। ফাইলে সাজিয়ে নিন।

  • ড্রেস কোড: মার্জিত এবং ফরমাল পোশাক (যেমন—ছেলেদের হালকা রঙের শার্ট ও গাঢ় প্যান্ট, মেয়েদের শাড়ি বা সালোয়ার কামিজ) তৈরি রাখুন।

  • কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স: নিজের জেলা, রাজ্য এবং দেশের সাম্প্রতিক ঘটনা, বিশেষ করে শিক্ষা সংক্রান্ত যোজনাগুলো সম্পর্কে জানুন।

  • ডেমো টপিক: অন্তত ৫টি আলাদা আলাদা ডেমো টপিক (বাংলা, ইংরেজি, গণিত, পরিবেশ থেকে) খুব ভালো করে প্র্যাকটিস করে রাখুন। তবে মুখস্থ নয়, কনসেপ্ট ক্লিয়ার রাখুন।

“সুযোগ বারবার আসে না”—এই প্রবাদটি চাকরিপ্রার্থীদের জন্য ধ্রুবসত্য। দীর্ঘ আইনি লড়াই এবং অপেক্ষার পর যখন নিয়োগের দরজা খুলছে, তখন নিজের ১০০ শতাংশ দিয়ে চেষ্টা করুন। উত্তরবঙ্গ থেকে ইন্টারভিউ শুরু হওয়ার অর্থ হলো, উত্তরবঙ্গের প্রার্থীদের হাতে সময় সবথেকে কম। তাই আজ থেকেই, এখন থেকেই প্রস্তুতি শুরু করুন। মনে রাখবেন, ইন্টারভিউ বোর্ডে আপনার সার্টিফিকেট দেখার চেয়ে বেশি দেখা হবে আপনি মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে কতটা যোগ্য।

(ডিসক্লেইমার: এই প্রতিবেদনটি বিভিন্ন সূত্র এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। চূড়ান্ত তারিখ এবং নিয়মাবলি পর্ষদের অফিশিয়াল বিজ্ঞপ্তিতেই পাওয়া যাবে।)